আশাবরী

সন হিল নি টে ১০ শতামাচরণ দে স্ভ্রীট, কলকাতা ১২

প্রথম প্রকাশ, 3৫ই আগস্ট ) শ্রাবণ ১৩৬৭

মিত্র ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিং, ১০ শ্যামাচরণ দে স্রট, কপিকাতা ১২ হইতে এস. এন, রায় কর্তৃক প্রকাশিত ভ্রীসত্যহরি পান, উপেকন্দ্ শ্রিন্টং প্রেস, ১৬ ভীষ ঘোষ লেন, কলিকাতা কর্তৃক মুদ্রিত

টৎসগ

পুত্রপ্রতিম ডাক্তার শ্রীদ্বারিকানাথ ঘোষ কল্যাণীয়েষু

নাম সত্যেন সত্যেন ভদ্র

ছোঁড়াটা! হততাগ! | বয়স বছর পচিশ। মামার বাড়িতে থেকে ইতিহাসে এম-এ পান করেছে। চাকরি জুটছে না। অনেক দরখাস্ত করেছে চারদিকে কোথাও কিছু হয় নি। মামা যদিও তাড়িয়ে দেন নি, মামীম! যদিও বলেন নি আমি আর তোমার জচ্যে হবেল। খাবার তৈরি করতে পারবে। না, তবু চলে এসেছে সে সেখান থেকে

রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। দেখে অনেক ফেরিওয়াল। ফেরি করছে, অনেক রিকশাওয়াল! রিকশ! টানছে, অনেক কুলি মাল বইছে, অনেক মজুর রাস্তা তৈরি করছে, অনেক মূর্খ লোক গতর খাটিয়ে পয়সা! রোজগার করছে সেকিন্তু কিছুই করছে না পয়স! রোজগার করবার জন্যে | ওসব করবার সামর্থ্য নেই তার। চাকরি জুটলে করতে পারত, চাকরি জোটে নি। ফ্যানের তলায় চেয়ারে বসে কেরানীগিরি করবার সুযোগ যদি পেত অনায়াসে করতে পারত কিন্তু সে স্থযোগ পায় নি। পাওয়ার আশাও নেই। তাই এখন ভিক্ষা করে। এ-ও একরকম উপার্জন পেটটা চলে যায়। রাস্তাতেই শোয়। কখনও কোনও বড় লোকের বাড়ির বারান্দায়। কখনও বা স্টেশনশ্প্্যাটফর্মে | কখনও ব| ফুটপাথের ওপরই সে কিন্ত নিতাস্ত নিঃসম্বল নয়। একটা ছেঁড়! কাথা যোগাড় করেছে। সেইটে পেতেই শোয় রাত্িরে। সেইটে জড়িয়ে পুজিন্নার মতে করে বগলে নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। গায়ে ছেঁড়া একট! আলখাল্লা কোট। কোটের পকেটে একটা খাতা আর একটা পেন্সিল। কবিত! লেখে। আধুনিক ধাঁচের কবিত| লেখবার চেষ্টা করে। সব সময়ে কিন্তু হেঁয়ালি বানাতে পারে না। মানে বোঝা যায়, মামুলী মানে।

আশাবরী

তবু চেষ্টা করে সে। কবিতা না লিখে পারে না ওটাই একমাত্র অবলম্বন। আর একটা অবলম্বন আছে-প্রিয়া। যে প্রিয়া নেই সেই প্রিয়া যে প্রিয়! বাস্তবে দেখা দেবে না, যার রূপ নিত্য নৃতন, সেই প্রিয়া | তার সঙ্গে সে রোজ কথা কয়। শহরে অনেক পার্ক আছে, স্কোয়ার আছে তারই-একটাতে বসে কবিত। লেখে সে ছুপুরে | ছুপুরে লোকজনের ভিড় থাকে না। কবিতা লিখে প্রিয়াকে শোনায় সেদিনও তাই করছিল কল্পন করছিল টা ছুপুরের রোদে

তার পাশে বসে আছে টুকটুকে ফরসা একটি মেয়ে। মাথায় ঘোমটা নেই পিঠে লম্বা-চওড়া। কালো বেণী ছুলছে পিঠ-কাটা রাউসের উপর | মুচকি মুচকি হাসছে আর নখ খাচ্ছে।

আকাশ, ছু'চো আর ফটকিরি

তালবাসে পালক-মেঘের চচ্চড়ি।

আমি বাসি না।

আমি ভালবাসি

গরম গরম ফুলকে! লুচি,

যে লুচি ভাজা হচ্ছে

কুষ্টি-উন্ননের ধিকি ধিকি আচে

মিষ্টি দৃষ্টির পরদার আড়ালে

আমার ইচ্ছে দেখে

হাসছে গ্যয়টে

- শেকসপীয়রকে জড়িয়ে,

ন্যাংচাচ্ছে গেঁটে বাত,

হাচছে শীলার,

কাশছে টলস্টয় |

ওরা ভাবছে

আমি সঙ্গত করব ওদের সঙ্গে তবল নিয়ে।

আশাবন্সী

কিন্ত করব ন৷ কি নেই। আমি একক, আমি স্বতন্ত্র, আমি অনন্য আমি ভিখারী হয়েও সম্রাট মনের বাসনার খিড়কির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল কামনা-টিকটিকি ল্যাজ ঘুরিয়ে, বললে আমিও। উপরে চেয়ে দেখলাম আকাশ নীরব সে কিছু বলছে না| তুমিও বলবে না? সে জানে তার পাশে প্রিয়া নেই। তবু চেয়ে দেখল একবার | রোজই দেখে | দেখতে পেল দূরে আর একটা লোক তুরু কুঁচকে চেয়ে আছে তার দিকে এগিয়ে এল লোকটা

“কি লিখছিলে-'

কেমন যেন লজ্জা হল তার। খাত পেন্সিল পকেটে পুরে সলজ্জ হাসি হেসে বলল, “কিছু না”। পরক্ষণেই আত্মপ্রকাশ করল ভিক্ষুকট!।

বলল- “সমস্ত দিন খাই নি। কিছু দেবেন?)

লোকট।! ভুরু কুঁচকে দাড়িয়েই রইল একটু | তারপর একট। দশ নয়৷ ছুড়ে দিয়ে চলে গেল

পয়সাটা কুড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল সে পার্ক থেকে দাড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ ফুটপাথের উপর |

জনআ্রোত চলছে আর চলেছে মোটর গাড়িরক্দীরি। চলেছে ট্রাম রাস লরি। চলেছে টেস্পো, ঠ্লোগাড়ি।

আশাবরী

তারপরই হঠাং একটা গোলমাল পাকিয়ে উঠল একটু দূরে লোক জমে গেল। কাকে যেন মারছে অনেকে মিলে একটা পকেটমার ধরা পড়েছে সে-ও এগিয়ে গেল | দশ-বারো৷ বছরের ছোঁড়া, একটা, নির্দয়ভাবে মারছে তাকে নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে।

“আর কখনও করব না--আমাকে ছেড়ে দাও, আর মেরে না, তোমাদের পায়ে পড়ি ।,

তারস্বরে চীৎকার করছে ছেলেটা |

ওর! কিন্তু ছাড়বে না। মেরেই চলেছে তারপর পুলিস এল।

সরে গেল সেখান থেকে

গেল একট! খবরের কাগজের স্টলে সেখানে কাগজগুলো উল্টে নিরুদেশ প্রাপ্তি” অংশটা দেখল | রোজই দেখে। না, তার মাম! তার খোজে কোন বিজ্ঞাপন দেয় নি।

চলে গেল হাটতে হাটতে হাঁটতেই লাগল অনেকক্ষণ | তারপর একটা চানাচুরওলার দেখা পেল। চানাচুর কিনল খানিকটা | তাই চিবুতে চিবুতে আরও খানিকক্ষণ হাটল। পাব্যথা করতে লাগল। বসে' পড়ল শেষে ফুটপাথের ওপরই একট বাড়ির দেওয়ালে ঠেস দিয়ে।

॥২॥

চিত্তরঞ্জন আভিনিউ দিয়ে হাঁটছিল | পাশে সামনে পিছনে লোক চলছে। স্ত্রী-পুরুষ, বালক-বালিকা, যুবক-যুবতী, প্রৌঢ়-প্রৌটা নানা রঙের পোশাক পরা | অধিকাংশই সাহেবী পোশাক | কেউ কাউকে চেনে ন1। সবাই চলেছে নিজের ধান্দায়। রাস্তার উপর ট্র্যাফিক জ্যাম। হর্ন বাজাচ্ছে মোটরগুলে|। একটা সাইকেল ্রিংগ্রং ট্রিং করতে তে এগিয়ে এল। তার ওপর বসে আছে এক 'অদ্ভুত মৃতি।

আশাবরী

মাথায় গান্ধী টুপি, গায়ে লাল কামিজ,পরনে কালে! চোং প্যান্ট। তার পিছনে তাকে জড়িয়ে বসে আছে একট! মেয়ে। তার মাথায় চুল বব করা, চোখে কাঙ্গল, বড় বড় দাত ওপরের ঠোট দিয়ে ঢাকবার চেষ্টা করছে। হুতভাগ! ছোড়াট দাঁড়িয়ে পড়ল সেখানে জ্যাম হওয়ার জন্যে সাইকেলটা আর চলছিল না| এক পা মাটিতে রেখে সাইকেলটাকে কেরে দীড়িয়ে ছিল গান্ধী টুপি। মেয়েটাও নেবেছিল।

সমস্ত দিন খাই নি মা;

হাত পেতে দ্রাড়াল সে মেয়েটার কাছে। মেয়েটা ঘাড় অন্য দিকে ফেরাল। তখন দেখা গেল তার ঘাড়ে একটা কালে। জড়ুল আছে। জড়ুলের উপর পাউডার লেগেছে একটু ছোঁড়াটার অকারণে মনে হল, চুল বব. না করলে জড়ুলট ঢাক। পড়ত। মোটর হ্ন দিচ্ছে চারদিকে নানা জাতের হন শুধু মানুষের নয়, শবদেরও ভিড় হয়ে গেল চারদিকে হঠাৎ খুব জোরে জোরে হুইসলও বাজতে লাগল। পুলিসের হুইসল | একগাদা লোক রাস্তা থেকে উঠে পড়ল ফুটপাথের উপর | একটা লেবুওল৷ ফুটপাথে লেবুর পশরা বিছিয়ে বসেছিল। সে হাই! করে উঠল জোরে তার লেবুর উপর দিয়ে লোক চলেছে। হুমড়ি খেয়ে সে শুয়ে পড়ল লেবুগুলোর উপর। তারপর তার কি হল সে আর দেখতে পেলে না। জনতার ধাক্কায় সে ছিটকে গেল। হঠাৎ লক্ষ্য করল সেই, জড়ুলওয়ালা মেয়েটা আর নেই। সেষ্জাড়িয়ে আছে একটা মেওয়ার দোকানের সামনে সামনেই একট প্রকাণ্ড জ্যাম্‌।

কাঁজুবাদাম। তার খুব প্রিয় জিনিস। চেয়ে রইল খানিকক্ষণ জারটার দিকে তার চোখে বোধহয় লোলুপত। ফুটে উঠেছিল দাড়িতে মেহেদী লাগানো দোকানদার হঠাং ভারি গলায় প্রশ্ন করল-_ ক্যা দেখতো হে।?

'কাজু।

আশাবরী বারো রুপিয়ে কে-জি ছেলেট। দাত বের করে বললে, “মায় ভূখা ছা মগর পয়সা নেহি হ্যয়।

'দাড়িতে মেহেদী লাগানো লোকট। তখন পকেট থেকে ছোট্ট একটা আয়না আর চিরুনি বার করে চুল আচড়াতে লাগল রাস্তায় হৈ হৈ উঠল একটা আবার জনতার একটা ধাক্কা খুন হয়ে গেছে, খুন হয়ে গেছে" চীৎকার করতে করতে একটা লুংগিপরা লোক বৌ করে ঢুকে পড়ল পাশের গলিটাতে।

সে-ও ঢুকে পড়ল। খুব সরু গলি। গলির মুখেই একটা কল থেকে অনবরত জল পড়ছে জলের কলটা ভাঙ্গ৷ | অনেক দিন থেকেই জল পড়ছে বোধ হয়। নীচের শানটা ক্ষয়ে গেছে। আর একটু গিয়ে দেখতে পেল, ছুটে! ছোড়া ব্যাটবল খেলছে একজনের হাতে একটা কেরোসিন কাঠের ব্যাট, অন্যজনের হাতে একটা! ন্যাকড়ার বল। পাশের রাস্তাতেই যে তুমুল কাণ্ড হচ্ছে সে খেয়ালই নেই ওদের। খেলে চলেছে। তাদের পেরিয়ে আর একট। ছোট্র দোকান পাওয়া গেল। দোকানের মালিক যুবতী নারী একজন। যুবতী দেখলেই মন ছোক ছোক করে ছোড়ার। দাত বের করে দাড়িয়ে পড়ল। জঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা ভিতরের দ্রিকের একট! ঘুপচি ঘরে অন্তর্ধান করল হঠাৎ | বেরিয়ে এল হৌতক। গোছের ঘাড়েগর্দানে একট! লোক তার-গলায় কালো সুতো দিয়ে লটকানে। একটা মাছুলী। দোকানে ছোট্ট একট গ্রাস কেস। কাচের ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে লাল কাকড়ার ঝাল। কিছু শুকনে৷ আলুর দম। কিছু বেগুনি ফুলুরিও। হোতকা লোকট। তার পানে ভ্রকুটি করে চাইল একবাঁর। তারপর দোকানের ঝাপটা তুলে দিল। আবার চলতে লাগল সে। কিছু দূরে গিয়ে দেখল একট! আবগারির দোকান। দোকানে বসে আছেন যিনি, তিনি গীতাপাঠে মগ্ন| বাইরে থেকেই . দেখা যাচ্ছিল বইয়ের মলাটের উপর ্বর্ণাক্ষরে লেখা-_ভ্রীমন্তাগবত

আশাবনী

গীতা |

“সমস্ত দিন খেতে পাই নি বাবা)”

গীতা নিরুত্তর |

“মস্ত দিন খেতে পাই নি বাঁবা।,

আবাঁর গীতা নিরুত্তর |

“সমস্ত দিন খেতে পাই নি বাবা ।!

গীতা জানল বন্ধ করে দিলেন

আবার হাটতে লাগল সে সত্যিই বড্ড ক্ষিধে পেয়েছিল তার। একটা! বন্ধ ছুয়ারের কড়া নাড়তে লাগল অবাশষে।

কপাট খুলল।

“কি চাই__

বিজ্ঞ ক্ষিধে পেয়েছে বাবা?

পাশের ঘর থেকে কে যেন গাক করে উঠল, "মাফ কর বাবা ওরে কপাট্ট। বন্ধ করে দে

থাম থাম। আজ যে খোকার জন্মবার | ভিকিরিকে ফিরিয়ে দিস না। রাত্তিরের যে রুটিগুলো আছে দিয়ে দে| তরকারিও আছে খানিকট।।

খান ছুই রুটি আর একটু ফুলকপির তরকারি জুটে গেল। সামনের বারান্দায় বসে খেল সেটা। কাপড়েই হাত মুখ যুছে ফেলল একটু জল পেলে হত-_সামনের বাড়ির দরজ! কিন্তু বন্ধ হয়ে গেছে। উঠে হাটতে লাগল। অনেক দূর হেঁটে কল পেল একট, খুলে অনেকখানি জল খেয়ে ফেলল। আবার কিছুদূর হেঁটে পাওয়া গেল ছোট্ট একট! পার্কের মতন। লোহার বেঞিও রয়েছে একটা | সেইখানে গিয়ে বসে রইল আকাশের দিকে চাইল। আশপাশের বাড়িগুলোর দিকে চাইল | সব পরদা-লাগানে। জানল! যে জানলায় পরদা নেই, সে জানলাট। ফাকা | কেউ নেই সেখানে খাত। পেন্সিল বার করে কবিতা লিখতে শুর করল সে।

আশাবয়ী

রাম্না-করা কাকড়ার লাল লাল ঝালে কাজুবাদামের নোনতা মিষ্টি ব্যাদে ঘিয়ে ভাজ! পেঁয়াজের গন্ধে

হিং-দেওয়া কচুরির ফিং-দেওয়া মাধূর্ধে হাতে টানা রিকশার টুন টুন আওয়াজে দাতভাঙ্গ। চিরুনির ফাঁকে ফাকে

চুলের জটাপটিতে

দেখতে পাই তোমাকে

আর আমি-_

আমি তখন ব্যাংকের হিসাব মেলাই যদিও আমার কোন ব্যাংকে হিসেব নেই | যদিও মোটর নেই

তবু দেখি মোটরে তেল আছে কি না সপ মেঘেদের পিছন দিকে

আকাশের যে নীল গলিটা__ অন্যমনস্কতার মেঘে ভেসে ভেসে সেখানে আস তুমি মাঝে মাঝে। আমাকে দেখেও দেখ না।

নির্মলদের বাড়ির লোম-ওঠা কুকুরট? পিচুটি-ভরা চোখ দিয়ে

কটাক্ষ হানে আমার দিকে | ক্ষীণমার্জারীরা আড়-চোখে চায়, রুজ-পাউডার-মাথ। ঘুজঘুজে মেয়ের! ভঙ্গী করে নানা রকম।

আমার ব্যাংকের হিসাবে গোলমাল হয় মোটরের ট্যাংকে পেট্রল কমে যায়। তবু আমি দমি না

আশাবরী ১১

না-পাওয়া কাকড়ার লাল দীড়াটা

চিবোই বসে আনমনে |

আর ভাবি টপসি কার নাম?

কুকুরের, না, মানুষের ?

হঠাৎ দেখতে পাই

অন্ভমনস্কতার মেঘে চেপে

ভেসে যাচ্ছ তুমি নিরুদ্দেশ যাত্রায়

আমি কি করে যাব?

আমি ভারী, ভাসতে পারি না

মোটর চড়ি

কিন্তু মোটরে যে তেল নেই।

শুনছ 2

কেমন হয়েছে কবিতাট। ?

পাশে কেউ নেই। কল্পনা করছিল সাঁওতাল কিশোরীর মতো লাবণ্যময়ী তার প্রিয়া বসে আছে তার পাশে নেই। কেউনেই। উঠে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে হাওয়াও উঠল একটা | সেই হাওয়াতে

উড়তে উড়তে এল একট! কাগজ উড়তে উড়তে তার দিকেই এল | তুলে নিয়ে দেখল বিখ্যাত দৈনিক কাঁগজের ছেঁড়া-পাতা একট! উ্টো পিঠে একজন বিখ্যাত লোকের ছবি। ছবির উপর ময়লা! ' লাগানো | বড় ছুখ হল। ইচ্ছে হল ওই বিখ্যাত লোকটির ঠিকান। খুঁজে তার পায়ে ধরে গিয়ে ক্ষমা চাইতে চুপ করে ্াড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। নাকের পাতা ছুটো কাপতে লাগল। হঠাৎ সামনের বাঁড়ি থেকে একটা ষণ্ডা লোক বেরুল, তার হাতে চেনশ্বাধা মস্ত একটা কুকুর। আযালসেশিয়ান নয়, বুলটেরিয়র সাদ! গায়ের ভিতর থেকে গোলাপী আভা বেরুচ্ছে। কেমন যেন একটা রোখা-রোধ ভাব। বুলটেরিয়ার কখনও দেখে নি। অবাক হয়ে চেয়ে রইল। ভয়-ভয়ও করতে লাগল একটু লোকট। পার্কেই

১২ আশখাবরী

ঢুকছে অন্য গেট দিয়ে সরে পড়ল সে। হঠাং মনে হল সার! জীবনটাই সে পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে। বাল্যকাল থেকেই গ! বাঁচিয়ে চলছে। মুখে বলেছে_ সম্মুখ-সমর। কিন্তু সন্মুখসমর দেখে নি কখনও, কোথাও গোলমাল দেখলেই সরে পড়েছে পার্ক থেকে বেরিয়ে চোখে পড়ল পুব দিকের বাড়ির বাইরের বারান্দাটি দিব্যি চকচকে ঝকঝকে বোধহয় মোজেইক করা এগিয়ে গিয়ে দেখল তাই। কারে। চকচকে ঝকঝকে জিনিস দেখলেই নেবার লোত হয়েছে বরাবর এখনও হল চারদিকে কেউ নেই। সটান উঠে শুয়ে পড়ল বারান্দাটাতে। মাথায় কাথার পুলিন্দাটি দিয়ে বেশ বাগিয়ে শুলো, পাশ ফিরে। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল। অগাধে ঘুমুতে লাগল। বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙ্গল নাচগানের শবে দেখলে, পার্কে একটা ছোড়া নানা ভঙ্গী করে নাচছে আর গাইছে__ ওগো আমার মা!ননী নাকছাবিটি আনিনি কাল আনব, কাল আনব, কাল আনব মাইরি বলছি কাল নয়তো পরশু বড় জোর তোরশু পান্না থাকবে ওতে লো ওগো আমার ডেনডেমোনা আমি তোমার €থেলে।। গান গেয়ে গেয়ে ক্রমাগত নাচতে লাগল ছোড়াটা। আর পয়স। পড়তে লাগল চারদিক থেকে। প্রতিটি বাড়ির জানলায় ভিড়। সবাই পয়স। দিচ্ছে কবি দেখতে লাগল দাড়িয়ে | আধ ঘণ্টা) নেচে একগাদ। পয়স। কুড়িয়ে ছেলেট। ঘুরে ঘুরে অভিবাদন করতে করতে চলে গেল কৰি

পিছু নিল তার। পিনছেন তাই |:

আশাবরী ১৩

“আমাকে ডাকছেন ?

হ্যা আপনাকে চমতকার লাগল আপনার নাচ আর গান। মনে হয় আপনি লেখাপড়াও জানেন-_-;

“না, আমি মুখ্য |,

“তাহলে ডেসডেমোনা! আর ওথেলোর কথ! জানলেন কি করে ?

“আমি যাত্রাপার্টিতে ছিলাম যে। ওথেলে। নাটকটার বাংলা করে আমাদের অধিকারী মশাই নাবাবেন ভেবেছিলেন | ভালো ডেসডেমোনা পাওয়। গেল না। পেঁচামুখী পটলিকে মানালো না। তখনই জেনেছিল।ম ওথেলো আব ডেসডেমোনার লভ হয়েছিল |,

“কোন্‌ যাত্রাপার্টি ?

“সে দল ভেঙ্গে গেছে ওই পটলিকে ঘিরেই আগুন জ্বলল। আমি সেখানেই নাচগান শিখেছিলাম তেনা মাস্টারের কাছে। তিনিই তো গানট। লিখে দিয়েছেন |,

“তেন মাস্টার? কে তিনি-,

"ভালো নাম ত্রিনয়ন | তেনা তেন বলে ডাকে সবাই চমতকার নাচ শেখায়, ভালে গান বাধতে পারে ।'

“কোথায় থাকেন তিনি ?'

£চিৎপুরে একসঙ্গেই থাকি আমরা ছোট একট! ঘর নিয়েছি তবলার দোকানের উপরে

তার পরিবার নেই বুঝি ?

“কেউ নেই। আমিই তার পরিবার সন্ধ্যাবেলা গিয়ে রোধে বেডে খাওয়াই 1:

পিয়ে-টিয়ে করেন নি বুঝি ?,

না।। একটি মেয়েমামুষের সঙ্গে ছিলেন| সে ঝেটিয়ে বিদেয় করে দিয়েছে রগচটা মেজাজী লোককে সহা করবে কে। আমাকে তে! প্রায়ই ঠ্যাঙায়। গুণীকিস্ত। শুধু গান-বাজনায় নয়, গুনতেও পারে | এর সঙ্গে কথ আছে আমি সমস্ত দিন নেচে যে

১৪ আশাবরী

পয়সা পাব তার অর্ধেক দিতে হবে ওকে | ঠিক গুনে বুঝতে পারে আমি কত পয়সা পেয়েছি একদিন তঞ্চকতা৷ করেছিলাম, মেরে আমার পস্ত! উড়িয়ে দিলে ।”

কত রোজ পান আপনি

“1 পীচ-ছ'টাকা হয়ে যায়|,

“তেন! মাস্টার আমাকে নাচগান শেখাবেন ?

“অনেক মার খেতে হবে কিন্তু। নাচে ভূল করলেই পায়ে সপাং করে বেত মারবে

“উনিই ওই গানট। বেঁধেছেন ?

যা,

ইনি ওর চেয়ে ভালো একটু সভ্যগোছের গান বাধতে পারেন না?

পারেন। কিন্তু বলেন ওসব গান চলবে না। এদেশে চুটুকি ফক্কোড় গান বেশী চলে। বলেন-_ রেডিওতে বড় ওস্তাদের গান কেউ শোনে না| শোনে বিবিধ তারতী |;

হি হি করে' হাসতে লাগল ছোড়াট। |

“আমাকে নিয়ে যাবেন আপনার তেন! মাস্টারের কাছে? আমিও নাচ শিখব-_'

“আপনি ধেড়ে কাতিক হয়ে গেছেন। নাচ আর আপনার দ্বার! হবে না। তেনা মাস্টার দেখেই আপনাকে দূর করে দেবে, তাছাড়া! আমি আপনাকে নিয়েও যেতে চাই না।,

কেন?

“নিজের সতীন আবার কেউ জোটায় নাকি ?

হি হি করে হাসতে লাগল দাতগুলোতে পানের ছোপ ধরেছে চোখ হুটোতে আলো! নাচছে।

আচ্ছা চলি।

কোমরে হাত দিয়ে মাথা! নেড়ে আর একটা গান ধরলে ছোবর]।

তন্‌ মন্‌ ধন সব দিয়া তব ভি কুছু নেহি পায়া দিন্‌ গিয়া রাত গিয়া তব. ভি প্যারি নেহি আয়।। তারপর হঠাৎ একছুটে চলে গেল। দাড়িয়ে রইল ছেলেট!।

“কি হে, তুমি এখানে কি করছ? কে তুমি_

পাশের বাড়ির দরজা খুলে একটা গোঁফ আর জুলপি-ওলা লোক বেরিয়ে এল।

“আমি এমনি দাড়িয়ে আছি।"

“এমনি ফধাড়িয়ে থাকে নাকি কেউ! নিশ্চয় কিছু মতলব আছে তোমার |

“আমি তিক্ষা করি-_

“কিছু হবে না এখানে | সরে পড়। জনার্দন যদি এসে পড়ে ঠেঙিয়ে হাড় গুড়িয়ে দেবে এখান থেকে প্রায়ই জিনিসপত্র চুরি যাচ্ছে-_

“আমি এখুনি চলে যাচ্ছি। আমাকে দয়! করে দিন কিছু বড্ড ক্ষিধে পেয়েছে--”

“কিছু পাবে না যাও.

“আপনারা তো এখুনি নাচ দেখে ওই ছেলেটাকে কত পয়স! চিলির

তুমি নাচ দেখাও, তোমাকেও দেব | সোজা নাক দেখানোতে কোনও বাহারি নেই | ঘুরিয়ে নাক দেখালে তবু কিছু আছে ছোঁকর! ঘুরিয়ে নাক দেখাল, তুমি সোজা নাক দেখাচ্ছ। সরে পড় এখান থেকে---

দড়াম করে কপাটট। বন্ধ করে দিলে সে। ছোড়া আবার

১৬ আশাবরী

হাটতে লাগল কিছু দূর গিয়ে দেখল একট! সরু গলির মোড়ে প্রকাণ্ড একট। লাল বাড়ি। রাস্তার দিকে বেশ বড়্‌একটা বারান্দা | বাড়িতে সে ঢুকতে পারে না, কিন্তু বারান্দায় বসতে পারে। বারান্দার ওধারে একটা রাস্তার কুকুরও কুগুলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। এধারে গিয়ে বসল সে। খুব ক্ষিধে পেয়েছিল। হঠাৎ পিছনের আনলাট! খুলে গেল। সে মুখ ফিরিয়ে দেখল, একটি প্রৌটা মহিলা দাড়িয়ে আছেন। তাঁর মনে হল একটি মাতৃমৃত্তি যেন দাড়িয়ে আছে।

করুণ দৃষ্টি তুলে তার দিকে চাইতেই তিনি বললেন--কে ভূমি বাবা ?

“আমি ভিকিরি মা। বড্ড ক্ষিধে পেয়েছে, অনেকক্ষণ কিছু খাই নি_,

“তোনার গায়ের কাপড় জ।মাঁও তো! খুব ময়লা | তুমি তিকিরি হ'লে কি করে? তোৌমাঁর বাবা মা নেই

না। মামার বাড়িতে থাকতুম। সেখান থেকে পালিয়ে এসেছি |?

“কেন?

ছোড়াটা চুপ করে রইল মাথা হেট করে। কারণ ণকেন'র উত্তর দেওয়া সহজ নয়।

'তৃমি দাড়াও একটু

মহিল। অন্তর্ধান করলেন। তার একটু পরেই একটি চাকর এসে সদর দরজ। খুলল

“এই নাও ।,

একটি মাটির সরায় কিছু খিচুড়ি। একট। সন্দেশ তাছাড়া ভাজ! কয়েক রকম।

এত খাবার আমাকে দিলেন ?'

ছ্যা। কাল সরম্বতী পুর্জো ছিল। তারই ভোগ ।'

আশীবরী রর

চাঁকরটির কাধে একটি খদ্দরের কোট আর ফরসা কাপড়ও ছিল একখান। |

“এগুলোও তোমাকে দিয়েছেন মা।!

একটু হক্চকিয়ে গেল ছেলেটা তারপর খাবারের সরাটা নিয়ে সেইখানেই দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে লাগল | দেখল খিচুড়ি, তরকারি, সন্দেশ__সব বরফের মতো ঠাণ্ডা বোধহয় “ফ্রিজে ছিল। তার মানে এর! বড়লোক প্রচণ্ড বড়লোক। এত বড় বাড়ি, বাড়িতে পূজো হয়। বাড়িতে 'ক্রিজ' আছে। তার সঙ্গে এক বন্ধু পড়ত-_- তার নাম দিব্যেন্্র দাস। সে বলত-_দেখড এট জানবি বড়লোক মাত্রেই আমাদের শত্রু | ওদের ধবংদ করলে আমাদের মুক্তি দিব্যেন্ছু তিনবার ফেল করে ম্যাট্রিক পাস করেছিল বলত-_একজামিনাররা বড়লোকের ছেলেদের পাস করিয়ে দেয়ব-আর গরীব ছেলেদের ফেল করায়। ইচ্ছে করে করায়। দিব্যেন্ত্ব কোনও ক্লাসেই নাকি একবারে প্রমোশন পায় নি। তার সঙ্গে আই-এ পড়ত। ফেল করেছিল। সে যে অপদার্থ কথ কিন্তু একবারও স্বীকার করত ন৷ সে। বলত-_তলে তলে--হু' ছ'-_-অনেক ব্যাপার আছে ভাই। আমি যেগরীব। দিব্যেন্ুর কথা শুনে শুনে তারও মনে এই ধারণাট! গেঁথে গিয়েছিল যে বড়লোক মাত্রেই পাজী, গরীবরা সব ভালো এখন কিন্তু এই ক্ষিধের মুখে খাবার পেয়ে তার ধারণাটার রং বদলে গেল হঠাৎ। মনে হল, না, সব বড়লাকের। খারাপ তো নয়। আমাকে উনি খাবার জামা কাপড় না দ্রিলেও তো পারতেন! যারা আমাকে তাড়িয়ে দিলে তাদের মধ্যে গরীবও তো। অনেক ছিল।

খেয়ে রাস্তার কলে জল খেয়ে আবার হাটতে শুরু করঙগ সে। মনের ভিতর কিন্তু জুলফিওল! সেই লোকটার কথাগুলে৷ জাগতে লাগল ঘুরিয়ে নাক দেখালে বাহব দেয় সবাই ।-..বড় রাস্তায় সে পড়েছিল। দেখল সারি সারি গাড়ি চলছে, প্রত্যেক গাড়িতে তুলোর বস্তা গাড়িগুলে। পার হল তো এল লরির সারি এতেও সারি

১৮ আশাবরী

সারি বোরা। তেরপল দিয়ে ঢাকা লরিগুলে! চলে যাবার পর সে রাস্তা পার হয়ে ওপারে ফুটপাতে গিয়ে পড়ল সেখানে একটি ইলেকট্রিসিটির থাম ছিল। তার নীচে একটা মুচি বসে জুতো! সেলাই করছিল। থামের ও-পাশটা খালি ছিল। সেইখানেই গিয়ে বসে পড়ল সে। পকেট থেকে বার করল খাতা আর পেন্সিল। কবিতা লিখতে হবে। সেই ঘুরিয়ে নাক দেখাবার কথাটাই মনে জাগছিল। শুরু করে দিলে__

সোজ। নাক দেখালে

বাহবা দেয় না কেউ

ঘুরিয়ে নাক দেখালে বলে-_ চমৎকার

মন কেমন করছে বললে

সবাই বলে সেকেলে

বলতে হয় পাংশু মনের কুট্‌কুটুনি জালাচ্ছে।

শুধু সবুজ বললে কান দেয় না কেউ।

উৎকর্ণ হয়ে ওঠে শ্যাওলা-সবুজ বললে,

পান্না-সবুজ বাতিল হয়ে গেছে আজকাল

ঠিক করেছি তাই

ভাইকে বলব বাবার ছেলে

সত্রীকে শালার দিদি

আর শ্বশুরকে শালীর দাদার বাবা

বাবাকে পিসেমশায়ের বড় শালা

এই সব হিসেব করছি

ক্রমাগত হিসেব করছি

হিসেবই করে যাচ্ছি

এমন সময় লাথি খেলাম,

মনে হল ঘোড়ার লাথি

পড়ে গেলাম মুখ থুবড়ে

আশাবরী ১৯

উঠে দেখি ঘোড়া নেই

কেউ নেই

আমার দিকে কটমটিয়ে চেয়ে আছে আমার মাত্রাবোধ।

আর তার পাশে তৃমি।

লজ্জিত হলাম

সে হয়তে। আরও লিখত। কারণ লেখার একটা ঝেণক এসে গিয়েছিল তার। কিন্তু হঠাৎ বাধা পড়ল। নীল রঙের প্রকাণ্ড একট! ধাম! এসে ধাকা মারল তাকে তার পর সে আবিষ্কার করল ধামা নয় পাছা! তার ঠিক পাশেই পেন্টালুন পরা একটা মেয়ে হেঁট হয়ে কি যেন কুড়াচ্ছে রাস্ত। থেকে | তার রঙ্গীন লজেন্সগুলো পড়ে গেছে ফুটপাতের উপর

মণি থাম না একটু ভাই লজেন্দগুলো পড়ে গেছে “শো” সাড়ে পাঁচটায় শুরু হবে। এখনও অনেক দেরি

_হিপি-মার্কা মণি একটু দূরে দাড়িয়েছিল। সে আকর্ণ বিশ্রান্ত হাসি হেসে বলল -তার আগে চীনে রেস্তোরায় যাব | চীনে মাল খাওয়াব তোকে মআাজ। সেখানে শ্রারা আমরা শিরি ফরহাদ বনে যাব একেবারে--বুঝলি-_

সব “স' গুলোই সংস্কৃত দন্ত্য 'স' উচ্চারণ করলে

“এই ট্যাকসি_

ট্যাকসি দ্াড়াতেই উঠে পড়ল তারা বে ক'রে চলে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে সরে গেল তার প্রিয়া তার মানসী | সে যেন একটু আগে এসে বসেছিল তার পাশে। তার নানারকম চেহারা কল্পনা করে সে। কিন্তু বিভিন্ন চেহারার ভিতর তার প্রিয়! প্রিয়াই থাকে, অপ্রিয় হয় না কখনও তাঁর প্রিয়া পেলব শোভন মধুর অবর্ণনীয় এই মেয়েটাকে দেখে সে লজ্জায় মরে গেল। নিশ্চিহ্ন

সও আশাবরী

হয়ে গেল তার পাশ থেকে

হঠাৎ আবার একটা! হৈ হৈ উঠল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখলে একটা মোষের গাড়ির একটা মোষ খুলে গিয়ে দৌড়চ্ছে, একটা ছুটস্ত ট্যাকসির সঙ্গে ধাকা খেয়ে পড়ে গেল সেটা! ট্যাকসিটাও থেমে গেল, লোকে লোকারণ্য আবার ্রাড়িয়ে গেল মোটরের সারি। দেখতে পেল একট! ফুল দিয়ে সাজানো মোটর থেকে চেলিপর! একটি সুন্দর বৌ রক্তাক্ত মোষটার দিকে চেয়ে আছে।

আরও ভিড় জমতে লাগল ভিড় বেশীক্ষণ ভালো লাগে না। আবার হাটতে লাগল সে। হাঁটতে লাগল। ক্রমাগত হাঁটতে লাগল। হাটতে হাটতে একটা আশ্চর্য প্রশ্ন মনে জাগল-_কেন আমি হাটছি? কেন আমি মামার বাড়ি থেকে পালিয়ে এলাম ? কি চাই আমি? কি খুঁজছি? চাকরি? চাকরি পেলেই কি আমি সুখী হব? মজুমদার মশাই বড় চাকরি করেন, কিন্তু তিনি কি স্থুখী? প্রায়ই তার মামার কাছে এসে হাউ হাউ করে কাদতেন। সুখী হলে কেউ অমন করে কাদে? এই সব আশ্চর্য প্রশ্নের একটা আশ্চর্য উত্তরও যেন আবছাতাবে মনে এল তার। তার মনে হল সে যেন নিজেকেই খুঁজছে, নিজেকেই সে যেন হারিয়ে ফেলেছে ভিড়ের ভিতর, নিজেকে খুঁজে পেলেই যেন আপাতত বর্তে যাবে সে।

জ্ঞানীরা “আত্মানং বিদ্ধি” বলে চড়া সুরে উপদেশ দেন, সেই সুরে উদ্ধন্ধ হয়ে নিজেকে খুঁজছিল না, ওর মনে হচ্ছিল ওর নিতান্ত “আপনজন” যেন কোথায় হারিয়ে গেছে, তাকে গেলেই বুঝি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে সে আপন জনের স্বরূপ কি? তা-ও জানা ছিল না তার। জান! ছিল না, তবু খুঁজছিল। এই ভিড়ে তাকে খুজে পাওয়। কি সম্ভব? তারপর হঠাৎ মনে হল তার প্রিয়ার কথ! যে প্রিয়াকে কখনও দেখেনি কখনও দেখবে না, তার কথ|। মনে হল তাকে পাই বা না পাই, সে বড় ভালো বড় সুন্দর, এই মরুভূমিতে সেই মরগান, সেখানে সবুজ আছে ফুল আছে ঠাণ্ডা! জন

আশাবরী ২১

আছে।

হঠাৎ তার মনে হল তাকে পাব কি? সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, না পাব না। তার তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে এই রূঢ় উত্তরটা দিলে কিন্তু তার অন্তরের অন্তস্তলে কল্পনার যে ফন্তুধার। বইছিল তার তীরে বসেছিল কে একজন সে বললে--পাবে পাবে নিশ্চয় পাবে।

কিছু দূর হেঁটে হঠাৎ থমকে দীঁড়িয়ে পড়ল সে। দেখলে একটা রোগ! চিনেম্যানকে একটা কুচকুচে কালো মেয়ে জল খাওয়াচ্ছে। জল ঢেলে দিচ্ছে একট! স্তদৃশ্ত মগ থেকে চিনেম্যানটা অগ্রলি পেতে অঞ্জলিতে মুখ লাগিযষেই জল খাচ্ছে কলগকাত। শহবের রাস্তায় কিছুই বিসদৃশ নয়, কিন্তু দৃশ্যটা ভারি অদ্ভুত মনে হল তার। কে ওই কালো মেয়েটা? ওর নাম নিশ্চয় শ্রাবণী ! মৃত্তি- মতী শ্রাবণ যেন। চিনেম্যানটার সঙ্গে ওর সম্পর্ক কি? হঠাৎ এক পাল ছাগল আর ভেড়া এসে পড়ল। ফুটপাথেও উঠে পড়ল তারা রাস্তায় তখন মোটরের ভিড় ছিল না। ভিক্টোরিয়া গাঁড় একটা দাড়িয়ে ছিল মোড়ের দিকে আর টুং টুং করে চলেছিল একট! রিকৃ্স1। সবাই 'কন্ত মভিভূত হয়ে পড়ল এই ছাগলদের ভিড়ে (ভিকৃটোরিয়া গাড়ির ঘোড়াটা কান খাড়া করে হ্ষোধ্বনি করে উঠল একবার কিন্তু তা গ্রাহা না করে কশাইখানার যাত্রী সব দ্রুতবেগে ছুটে চলতে লাগল মৃত্যুর দিকে

হাটতে লাগল আবার। এটা কোন্‌ পাড়? কোন্‌ রাস্তা? সব নিয়ে মাথ। ঘামাল না সে আর। ছু একটা রাস্তা ছাড়া সব রাস্তাই এক রঙা। অন্যমনস্ক হয়ে যেতে হোঁচট খেঙ্গ এক জায়গায়। ত্বপাকার বাঁধাকপি ফুটপাতের উপর। পাশেই একটা বাঙালী মিষ্টির দোকান-_1799+8 9%6968। বাঙ্গালীরা পারতপক্ষে বাংলায় দোকানের নাম লেখে না। হঠাৎ মনে হল কথাটা পরমুহূর্তেই কিন্ত ভূলে গেল আর একট লোকের ধাকা খেয়ে। তারপরই খানিকট। ফাক। ফুটপাথ -তার পরই একট৷ ছোট্ট পার্ক |

২২ আশাবরী

পার্কে গিয়ে ঢুকল সে। ঢুকে বসে পড়ল একট] বেঞ্চির উপর। আহ্‌! বড্ড পা ব্যথা করছিল অনেকক্ষণ বসে রল চুপ করে। তারপর খদ্দরের জাম। আর কাপড়ট। দেখলে | ছুটাই বেশ ভাল। কিন্তু কাপড়জাম। বদলাবে কোথায়! রাতে কোথাও বদলাতে হবে। আর একটা কথাও মনে হল। এহ কাপড়জাম। পরে ভিক্ষা করা চলবে কি? ফরসা! কাপড়জাম দেখে লোকের দয়ার উদ্দর্রেক হবে কি? দয়ার বা বিরক্তির? বিরক্ত হয়েই লোকে হ-এক পয়স। ভিক্ষে দেয় সাধারণত। সামনের একটা ইলেকট্রিক তারের উপর কাক বসে ছিল একট | তার পাশে আর একট কাক উড়ে এসে বসল। বসেই হা করল, আর প্রথম কাঁকট তার মুখে ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার খাইয়ে দিলে ওর মা নিশ্চয় একটা ছেলে গুলতি দিয়ে টিপ করছিল ওদের ওরা সে সঙ্গে উড়ে গেল। পার্কে অনেকক্ষণ কেউ এল না। তারপর এলো একটা কুৎসিত

কালে লম্বা মেয়ে। তার কাঁধে একট। লম্বা থলি পে আন্মনে কাগজ কুড়িয়ে সেই থলিতে ভরতে লাগল। তারপর চলে গেল। তার দিকে একবার ফিরেও চাইল না৷ | আকাশের দিকে চেয়ে দেখল একট! চিল চকোর দিচ্ছে চিল না শকুনি? ঠাহর করতে পারল না ঠিক। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল সেই রোগ! চিনেম্যানটাকে। বার করল কবিতার খাতা-_

অনেকদিন পরে টুংলিং এল |

বুঝতে পারলাম না

সে মানুষ ন৷ দিগন্ত পারের হাতছানি

এসে বললে, তেষ্টা পেয়েছে

বড্ড পিপানিত 'আমি

ওগে! বাঙ্গালী বাবু

আমার পিপাসা মেটাও।

ভদ্ক! শ্যামপেন বারগাগ্ডি রম কৌইয়াক্‌

আশাবরী ২৩

অনেক খেয়েছি পিপাসা মেটেনি।

নিয়ে গেলাম তাকে শ্রাবণীর কাছে

যার নিতল চোখের অতলতায়

ডুবে গেছে বড় বড় মানোয়ারি-জাহাজ |

সে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ

চোখের পাতা ছুটে কাপল একটু

তারপর বীশী বেজে উঠল

তার উদ্ভানিত চোখে মুখে।

সে বাঁশী বলল, তুমি

শত্রুর মুখোস পরে আছ

কিন্তু তুমি শত্রু নও

তোমার পিপাঁস। মেটাব আমি |

আমি ভারতবর্ষ |

আগেও তোমার॥পিপাসা মিটিয়েছিলাম |

হঠাৎ তার মনে পড়ল চীন-আক্রমণের কথা | সঙ্গে সঙ্গে মনে

পড়ল আমাদের দেশেই আমাদেরই আপন লোকের কি প্রতিদিন আক্রমণ করছে না আমাদের? পাড়ায় পাড়ায় কেন ঘরে ঘরেই কোন্দল জুয়াচুরি ধাগ্লাবাজি খুন জখম দলাদলি তো খবরের কাগজের প্রধান খবর এদেশে এরই ঘুর্ণাবর্তে তো আবতিত হচ্ছি আমরা, চোরের! চুরি করছে আর ভদ্রলোকের৷ মারা যাচ্ছে হঠাৎ তার মনে হল- কিন্তু না, আমি চাই না আমি জানি থাকবে না। চাবুকে জর্জরিত হয়েছে, কিন্তু চাবুক থেমে যাবে ! আমি চাই হঠাৎ সে গুলিয়ে ফেলল সব। কি চায় সে? নিজেই জানে না। তার মনে হুল অবাস্তব চাওয়াট! বাস্তব হবে না কখনও | তা উচ্চারণ করলে হে! ছে। করে হেসে উঠবে সবাই, কিন্তু তবু আশা ছাড়তে পারে না সে। আর একটা কবিতা লিখে ফেললে সে-_

কেমন যেন গুটিয়ে যায় সব

২৪ আশাবরী

আসে, খুব কাছে আসে-_ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাল-গোল পাকিয়ে যায় যেন। নিয়তি, ভগবান, কর্মফল, অদৃষ্ট। এদের মানলে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম কিন্তু মানি না, মানতে পারি ন। বুদ্ধি রাশ টেনে ধরে তাই সাজগোজ করি শুধু তারপর দিকৃবিদিকৃ-জ্ঞান-শুন্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি চিস্তার সমুদ্রে নাকানি চোবানি খাই তবু মনে হয় এই সমুদ্র থেকে হয়তো উর্বশী উঠবে এই ছুধ থেকেই মাখন আশা ছাড়িনি এখনও তাই আকাশ নীল সুর্য অলস্ত তুমি অপরূপ ঘাড় ফিরিয়ে দেখলে তার “তুমি” নেই। কিন্তু আর একজন বসে আছে বেঞ্চের ও-প্রাস্তে। চ্যোংপ্যাণ্ট পরা দাঁড়িওলা একট' ছেলে। গায়ে একট আধুনিক বুশ-শাট চোখে চশমা গলায় একট! বাইনাকুলার | কবিতা-লেখায় মগ্ন ছিল বলে' বুঝতে পারেনি এই অদ্ভুত লোকটি কখন এসে বসেছে। হা করে চেয়ে রইল তার দিকে। তারপর চোখাচোখি হতেই নমস্কার করলে সে ছেলেটিও নমস্কার করে হাসলে একটু। “আপনার গলায় ওট। কি ? 'বাইনাকুলার “কি করেন ওটা দিয়ে ??

আশাবরী ২৫

পাখি দেখি ।'

পাখী দেখেন? কেন?

“আর কিছু করবার নেই বলে

তার মানে?

“তার মানে আমি বেকার কেরানীগিরি করবার স্থযোগ পাইনি

ছোড়াটা হেসে বলল-_'আমিও_7

“কি করেন আপি ?”

রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই আর ভিক্ষে করি ।,

দুজনে হুজনের দিকে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর সেই লোকট] বলল-_চলুন তাহলে যাওয়া যাক-_;

চলতে লাগল ছুজনে হঠাৎ দাড়িওল! বলল, “আমি হিন্দু ।,

“কোথা যাচ্ছি আমর! ?

“বিশেষ কোন ঠিকানা! নেই | বিম্ুর কথায় এখানে ভূল জায়গায় এসে পড়ছিলাম। সে বলে দিল এই পার্কে নাকি কুলে! পাখী দেখ! যাবে। কিন্তু এখানে এসেই বুঝলাম যাবে না তো তকমা" আট সভ্য-ভব্য পাড়া, এখানে কি ওই গেঁয়ো পাখী থাকতে পারে? তিনতলায় জানলার ফাঁক দিয়ে দেখলাম কে একজন খাঁচায় কয়েকটা মুনিয়া পুষেছে | আহা খুনিয়ার ঝাঁক একবার দেখেছিলাম ভাগল- পুরে স্তানাডিস কম্পাউণ্ডে। মাঠের খানিকটা! হঠাৎ যেন উড়ে গেল আকাশে। এখানকার মাঠে জোড়া জোড়। ঘুধু বসে আছে, মানে প্রেমিক ঘুঘু দূরে নান! রঙের “নিয়ন” আলো জ্বলছে, আর মোটরের হর্ন শোনা যাচ্ছে | রাবিশ, আসুন, এই ট্রামটায় ওঠা যাক-_-

ছোঁড়াটা বললে “আমার পয়সা নেই-__”

“আপনি আম্ুন না। আমিই আপনার টিকিট কাটব। উঠে পড়ন।'

উঠে পাশাপাশি একটা বেঞ্চে বসে দাড়িওল। ছেলেটা! বললে -- “সিগারেট খান ?

২৬ আশাধরী না--

“আমি কিন্তু খাই। কন্ত ট্রামে খেলে আপত্তি করবে সবাই। তাই এখন খাব না। এইটে মুখে ফেলে দিই এসগ্ল্যানেডে নেবে সিগারেট ধরাব।,

একটা বড়ি মুখে ফেলে দিলে ছোকরা |

কি খেলেন ওটা__,

“নেশার বড়ি। খাবেন?

“না খেতেই পাই না, নেশ। করাব পয়সা পাব কোথা-_,

“কোন নেশ। নেই আপনার ?

“আছে কবিত৷ লিখি মাঝে মাঝে?

«ও তাই নাকি তাহলে তো আপনি গুণী লোক মশাই | চলুন আমার বাড়ি -বাড়ি মানে হোটেল। আপাতত একট হোটেলে থাকি বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গ | পাক সেনার অত্যাচারে পালিয়ে এসেছি। বিনোদ আমাকে এই হোটেলটা ঠিক করে দিয়েছে | বিনোদ আমার সহপাঠী ছজনেই আমরা প্রেমিডেন্সিতে পড়েছি ঢাকায় আমাদের বাড়ি। পরীক্ষ/। পাস করে সেখানেই গিয়েছিলাম চাকরির চেষ্টায় | এমন সময় যুদ্ধ বেধে গেল। আমার বা?-মাকে মেরে ফেললে ওরা, সে দানবীয় অত্যাচার বর্ণনা করা যায় না। গ!] শিউরে ওঠে কিন্তু সব মুসলমানরাহ খারাপ নয়। কাশেম বলে এক মুনলমানের সাহায্যে আমি আর আমার বোন তাম৷ পালাতে পেরেছিলাম। কাশেম আমাদের বাড়ির সহিন ছিল। ঘোড়া ছিল আমাদের। সেই ঘোড়! করে মাঠামাঠি ঘুরপথ দিয়ে কাশেম আমাদের পার করে দিয়েছিল। এখন হোটেলে আছি-,

ছোড়াটা বললে-_হোটেলে থাকতে তো পয়সা লাগে-_”

“আমার পয়সা আছে আপাতত আমার বাবা একটা ভালে কাজ্জ করেছিলেন কিছুদিন আগে তিনি এখানকার একটা ব্যাংকে আমার নামে আযাকাউণ্ট খুলেছিলেন। তার ভয় হয়েছিল ওদেশে

আশাবরী ২৭

হয়তো আর থাকা যাবে না। বাড়িটা বিক্রি করতে পারেননি নগদ টাক! সব তুলে এনে জম! করেছিলেন আমার নামে ভাগ্যে আমার নামে করেছিলেন তা ন৷ হলে'_হঠাৎ চুপ করে গেল সে। তারপর আর একটা বড়ি মুখে ফেলে চুপ করে বসে রইল অন্য- মনস্ক হয়ে গেল কেমন যেন। তারপর হঠাৎ উঠে দাড়াল।

“একট| চিল বসে” আছে-_দেখে আসি ওর ল্যাজটা-_+

ছোঁড়।টাও নেবে পড়ল তার সঙ্গে

গড়ের মাঠ। অনেক দুরে একটা ইলেকট্রিক থামের উপর বসে ছিল চিলট!।

“আপনি এখানে অপেক্ষ। করুন, আমি দেখে আমি আর আপনার যদি কৌতুহল থাকে আপনিও আমন

নাঃ, আমি এখানে দাড়।চ্ছি, আপনি দেখে আম্ুন |,

একট স্টলের কাছে দাড়িয়ে রইল সে। একটি কথাই মনে হতে লাগল--পাঁকসেনারা ওর বাবা মাকে হত্যা করেছে। এখন নেশ। করবার জন্য কি একটা বড়ি চুষছে আর পাখী দেখে বেড়াচ্ছে। চিলের ল্যাজ-_তাতে দ্রেখার কি আছে?

পাশে চেয়ে দেখল খবরের কাগজের স্টল একটা নানা রকম রডীন মলাটের পত্রিকা আর প্রায় প্রত্যেক পত্রিকার উপরই নানা ভঙ্গীতে মেয়েমামুষের ছবি লালসা-জাগানেো ছবি। ওপাশে একটা লোক ফল বিক্রি করছে। চমৎকার কলা রয়েছে কলা তার খুব প্রিয়। কত দিন যে কলা খাইঈনি_হঠাং মনে হল তার। হঠাৎ কয়েকজন বলিষ্ঠ পাঞ্জাবী ড্রাইভার হো৷ চো করে হাসতে হাসতে ওপাশে দাড়ানো লরিখলোর দিকে চলে গেল। একটা অর্ধউলজগ ফিরিঙ্গি মেয়ে খট খট করে চলে গেল সামনে দিয়ে চুল বব. করা। পরনের স্বার্ট উরুর অর্ধেকও ঢাকতে পারেনি খটখট করে একটা বাসে টঠল তারপর জানল! দিয়ে হাত নাড়তে লাগল কাকে সম্ভাষণ করছে তিডের মধ্যে ঠিক বোঝ! গেল না। একট! দাক্ী

২৮ আশাবরী

মোটর এসে দাড়াল মোটরের জানলায় একটি তরুণীর মুখ মনে হল যেন স্বয়ং লক্ষ্মী | সমস্ত দিন খাই নি মা__দয়! করে কিছু দিন | মেয়েটি ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে একটা টাক৷ দিয়ে দিল তাকে অবাক কাণ্ড হ্যা সত্যি একটা! টাকা সঙ্গে সঙ্গে সে দুটো কলা কিনে ফেলল ভালো মর্তমান কলা | দুটোর দাম নিল-_তিরিশ নয়া কলা খাওয়া শেষ করেছে এমন সময় সেই দাড়িওল' ছোকর। ফিরে এল

“চিলের ল্যাজ দেখলেন ?

“না। উড়ে গেল। আশ্চর্য ওর ল্যাজ! মনে হয় কতকগুলে। ছুরি যেন সাজানো আছে যখন ওড়ে তখন সেগুলো! ছুদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মনে হয় ল্যাজট! বুঝি চেরা ফিডে পাখীর ল্যাজে ছুটে! বাক ছোরা আছে চিলেরও অনেকগুলো | পাখীর ল্যাজ একটা আশ্চর্য জিনিস। দোয়েল আর দর্জি পাখীর ল্যাজ তোলা দেখে বোঝা যায় ওদের তেরিয়া ভাব, খঞ্জনের ল্যাজ দোলানে। যেন ওদের সদা-চঞ্চল সদা-ব্যস্ত স্বভাবের পরিচধ দিচ্ছে, কাজল পাখী আস্তে আস্তে ল্যাজ দোলায়, মনে হয় যেন একটু হিসেবী, থিরথির! পাখীর ল্যাজ দোলানো চমতকার, উপর-নীচ নয়, পাশাপাশি তার সঙ্গে একটু নমস্কার করার ভঙ্গীও আছে, বুলবুলির ল্যাজের তলায় আগ্চন- টকটকে লাল। ময়ুরের ল্যা তো দেখেছেন, তাকে আমর! পেখম বলি, কুলে পাখীও ওই রকম পেখম তুলে নাচে, যার খোজে আজ গিয়েছিলাম-_ কিস্তু_+

ছোকরা থেমে গেল হঠাং। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।

“কিন্ত কি-”

“মাকে মনে পড়ছে মায়ের একটা টিয়া ছিল। অদ্ভুত ছিল তার লেজ। সবুজে, নীলে হলুদের আভায় সে যেন একট! রঙের ঝর্ণা ম' পাখী তালবাদত। কাক চড়ুই শালিক সবাইকে খেতে দিত

আবার চুপ করে গেল। তারপর হঠাৎ আবার বলে উঠল-_ জানেন আমার সেই মাকে ওরা খুন করেছে খুন করবার আগে

আশাবরী ২৯

সতীত্ব হরণ করেছে, তারপর গুলি করেছে-_আমার মা কারও কোনও অনিষ্ট করেনি__ওরা__? হঠাৎ থেমে গেল আবার

চলুন যাই। হোটেল কাছেই-_ |

রাস্তা পার হওয়৷ সহজ নয়। মোটর গাড়ির সারি চলেছে। মানুষ অসংখ্য সবাই ছুটছে। ছোড়াটার মনে হল কে যেন ওদের চাবুক নিয়ে তাড়া করছে। প্রাণভয়ে পালাচ্ছে সবাই। একটা ফেরি ওয়াল! কিন্তু নিবিকারভাবে দাড়িয়ে আছে রাস্তার ধারে_ হাতে একট বাঁশ, তাতে অসংখ্য রভীন বেলুন ! ' ওপাশে সারি সারি রিকৃশ। | পরমুহূর্তেই হা হা করে উঠল সবাই._ একটা ছোট ছেলে ছিটকে গিয়ে পড়েছে রাস্তার মাঝখানে তার মা তাকে ধরবার জঙ্চে আলুথালু বেশে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ভিড়ের ভিতর দেখে মনে হল বিহারিণী | নাকে প্রকাণ্ড একটা নথ। মাথায় এক ধ্যাবড়। সিছুর।

হোটেলটি অভিজাত হোটেল তারই দোতলায় ছুটি ঘর নিয়েছে দাড়িওয়ালা ছোকরা | সিঁড়িতে উঠতে উঠতে দাড়িওয়াল। ছোকরা হঠাং জিগ্যেস করল-_“আপনার নামটা জিগ্যেস কর! হয়নি আমার নাম সাতকড়ি। আপনার ?,

“আমার নাম সত্যেন সত্যেন ভদ্র।

"ডাক নাম সাতু কি?

হা,

“আমারও ডাক নাম সাত অদ্ভুত মিল হয়ে গেল | বাঃ

ছাঁড়াটা অবাক হয়ে যাচ্ছিল। আরব্য উপন্তাসে আবু হোসেনের

গল্প পড়েছিল। বিংশ শতাব্দীতে সেই গল্পেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে কি! এমন একট! অভিজাত হোটেলে সে যে প্রবেশ করতে পারবে তা একটু আগেও কল্পনার অতীত ছিল

হঠাৎ কপাটটা খুলে একটি শেমিজপর! মেয়ে দেখা দিয়েই অস্তর্ধান করল নিমেষে

৩০ আশাববী

সাতকড়ি নিম্নকঠে বলল-_“তামা-_;

তারপর চেঁচিয়ে বলিল-_“ও তামাম্‌, নতুন বন্ধু পেয়েছি।'

ঘরে ঢুকে কাউকে দেখতে পেল নাসে। সোফা-সেটি দিয়ে সাজানো ঘর একপাশে একটা ছোট ডিভান রয়েছে ডিভানের উপর 'অনেক বাংলা ইংরেজি বই।/ ডিভানের পাশেই একজোড়া লাল স্যাণ্ডাল।

তামা কোথ। গেলে, কে এসেছে দেখ-_?

শেমিজের উপর একটি লম্বা কোট গায়ে দিয়ে একটি মেয়ে কপাট খুলে ঘরে ঢুকল। টুকে নমস্কার করল।

সাতকড়ি বললে--এর সঙ্গে রাস্তায় হঠাৎ দেখা কুলো পাখী খুঁজতে গিয়ে একে পেলাম এর ছুটি মহৎ পরিচয় প্রথম__ইনি আমাদের মতো বেকার, দ্বিতীয়ত উনি কবি ।,

তারপর ছোড়াটার দিকে ফিরে বলল-_“এর নাম তামা পুরো নীম নূরতামাম আমি সেট। ছোট করে নিয়েছি। আমার বাবার বন্ধু জাফর আলির মেয়ে ও। ওর বাড়িরও কেউবেঁচে নেই ওর বাবাকে আমরা জ্েঁঠু বলতাম। সুতরাং তামা আমার বোন আপনাকে আমর কি বলে ডাকব? মিতা, না! স্যাঙাৎ ?

নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে ছিল ছোঁড়াটা। তার মনে হচ্ছিল এদের বাড়ির সবাইকে খুন করেছে ববর পাক সেনারা অথচ এরা কত সহজভাবে কথা বলছে।

চুপ করে আছেন কেন? ভাব করুন তামার সঙ্গে খুব সাহিত্য-রসিক। বাংলায় অনার্স নিয়ে বি-এ পাস করেছে কবিত৷ খুব ভালবাসে

ছোড়াট! চেয়ে দেখল তামার চোখ ছুটে। প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে। নাকের ডগাট। ঈষৎ কাপছে যেন। হঠাং সে আশ্চর্য হয়ে গেল তার গায়ের রং দেখে রংটাও যেন তামার মতো লালচে অথচ উজ্জ্বল। মনে হল কি একটা বইয়ে যেন রেড ইগ্ডিয়ান যুবতীর ছবি দেখেছিল

আশাবনী ৩১

অনেকদিন আগে, তার গায়ের রং আর তামার গায়ের রং যেন এক। উজ্জ্বল তাতঅবর্ণ। কেমন যেন অভিভূত হয়ে পড়ল সে।

অপ্রত্যাশিতভাবে তামা! কথা বলল

“আপনাকে আমরা অতিথি বলে ভাকব। কখনও সেটা হবে “অতি” কখনও “তিথি”। নতুন রকম হল। রাজি?

ছোড়াটা তবুও নির্বাক হয়ে রইল | কোনও কথাই সরছিল না তার মুখ দিয়ে তার কেবলই মনে হচ্ছিল এদের জন্যে আমি কিছুই করিনি তো।

তাম! আবার ভিতরে চলে গেল।

বন্থুন দাড়িয়ে রইলেন কেন? চটপট ঘরের লোক হয়ে যান। তামা, খিদে পেয়েছে ।'

তামা আবার বেরিয়ে এল

বললে-_“সন্দেশ কিন্তু একটি আছে। সেটি অতিথিকে দেব। ডিম আছে, ডিমের অমলেট বানিয়ে দিচ্ছি | চা খাবেন, না কফি -_,

ছোঁড়াটা তখন বলল-_“য! দেবেন তাই খাব, খুব ক্ষিধে পেয়েছে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে- আপনাদের আতিথ্য গ্রহণ করবার আগে আমার পরিচয় আপনাদের জানানে। উচিত-_

হো হো করে হেসে উঠল সাতকড়ি। তামার চোখে-মুখেও একটা হাসির আভা ঝলমল করতে লাগল

ছোডাটা বলল-_“আমি ভিখারী রাস্তার সাধারণ নগণ্য ভিখারী আমি--”

তাম। বলল-_“আমরাও তিখারী-ভিখারী তো কি হয়েছে? যতক্ষণ সাতুর ব্যাংক ব্যালান্স “নিল” না হবে ততক্ষণ আমরা চালিয়ে যাব। আম্মুন ও-ঘরে ইলেকট্রিক স্টোভ আছে তারই পাশে বসবেন। মেজেতে বসেই খাওয়!-দাওয়া করি আমরা | আস্থন_

খেতে খেতে সাতু বলল, খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমর! ছজনেই কিন্ত বেরিয়ে যাব! ছুজনেরই ইনটারভিউ আছে ছ্‌; জায়গায়।

৩২ আশাবরী

আপনি কি থাকবেন এখানে ?'

অবাক হয়ে গেল সত্যেন |

বলল--আমাকে তো! আপনারা চেনেন না। আমাকে বিশ্বাস করে' বাড়িতে রেখে যাবেন ?

তামা! একগাল হেসে বলল--যাব। আপনি যদি আমাদের জিনিসপত্তর চুরি করে নিয়ে যান, তাহলে কি যে মজা হবে ! সাতু আবার সব নতুন জিনিস কিনে দেবে দেবে ন। সাতু ?

“নিশ্চয় দেব। কিন্তু উনি জিনিস চুরি করে পালাবেন না 1,

' ছু' কাপ চাঃ চার টুকরে। মাখনদেওয়া প।উরুটি, ছুটি ডিমের অমলেট এবং একটি সন্দেশ খেয়ে ক্ষুপ্রিবৃত্তি হয়েছিল সত্যেনের | তখনি সে যেন বুঝতে পেরেছিল কয়দিন সে প্রায় অনাহারেই ছিল খেয়ে ঘুম পাচ্ছিল তার | বলল-_-'আমার ঘুম পাচ্ছে আমি এখানে একটু ঘুমুই। আপনারা এলে তারপর চলে যাব ।,

“চলে যাবেন কেন?

সাতু জিগ্যেস করল।

টুপ করে রইল সত্যেন। তারপর বলল, “আপনাদের কাছে থাকবার দাবী অর্জন করি নি তো! ৷, তারপর হঠাৎ বলল-_পথে পথে ঘুরে বেড়াতেই আমার ভালো লাগে বেশী। আমি নিজেকেই খুঁজছি যেন| মামার বাড়িতে তাই থাকতে পারিনি

তামা বলল--বেশ না থাকেন, ন। থাকবেন। আমর তো আপনার নিজের লৌক নই যে জোর করব আপনার উপর |. কিন্তু একটা ফরমাস আছে। ফিরে এসে একটা কবিতা যেন দেখতে পাই। টেবিলের উপর কাগজ কলম সব আছে ।,

সাতু বলল--“'আর একট! কথা। আমাদের এখানে আপনার একট পার্মানেন্ট নিমন্ত্রণ রইল। যখন খুশী আসবেন। এতে রাজি তে। ?'

সত্যেন মুখে হাসি ফুটিয়ে চুপ করে' রইল

আশাবরী ৩৩

তামা বলে উঠল-_নতুন ধরণের উপম। দিতে হবে কবিতায় আমরা নৃতনত্বের পক্ষপাতী কিন্তু!”

সত্যেন হেসে বলল-_-“তা। তো। দেখতে পাচ্ছি লম্গা কোট পরা মেয়ে এর আগে দেখি নি। কোট আপনি করিয়েছেন ?'

না। এট! সাতুদার | আমাদের আরও নতুনত্'আছে, শুনবেন? সাতুদা রোজ নামাজ করে আর আমি গায়ত্রী জপ করি”

সাতু গম্ভীরভাবে বলল-_“অথচ আমর পরস্পরের প্রেমে পড়ি নি।,

কলকণ্ে হেসে উঠল দুজনেই |

বিকেলবেলা তামা ফিরে এসে দেখল প্যাডে একটি কবিতা লেখা বয়েছে।

পাকিস্তানের জঙ্গী ববররা বাংলাদেশের মা বোনদের উপর যখন অকথ্য অত্যাচার করছিল, জ্বালাচ্ছিল ঘর বাড়ি চালাচ্ছিল ছোর] ছুরি বেওনেট-বোমা যখন বাংলাদেশের জীবন্ত আত জীবস্ত কই মাছের মতো ছটফট করছিল নৃশংসতার তণ্ত কটাহে, দেশের বীবত্বসৌরভ যখন সগ্ভ-ভাজ। ইলিশ মাছের গন্ধের মতো বিচ্ছুরিত হচ্ছিল দিগদিগন্তে, তখন আমি কি করছিলাম? কিছুই করি নি। এক ফোটা জলও পড়ে নি চোখ দিয়ে হাহাকারের সাইরেন বাজছিল

ংলাদেশ জুড়ে

আশাবরী

সেই সাইরেন আমি শুনেছিলাম

কিন্তু ছুটে যাই নি পাগলের মতো

সীমান্ত পার হয়ে,

মহাভারতের পাণও্ডব হয়ে গিয়েছিলাম যেন.

'ড্রৌপদীর বন্ত্রহরণ দেখছিলাম মনে মনে

নিক্ষিয় সের মতো !

আমাদের সেনার! গিয়েছিল সত্য

কিন্ত আমি যাই নি

আমি নিটোল ছিলাম, অটুট ছিলাম আমার বুক ভেঙে যাঁয় নি।

কিছুই করি নি আমি।

একেবারে কিছুই করি নি কি? করেছিলাম, করেছিলাম, মনে পড়েছে-__ নপুংসকদের আড্ডাখানায়

টেবিল চাপড়ে তর্ক করেছিলাম

আর চা কফি উড়িয়েছিলাম

কাপের পর কাপ।

তামা, সাতু,

আজ বুঝলাম

তোমরা আমার কেউ নও অথচ সব। আজ চোখ ফেটে জল পড়ছে তাই। থাকতে পারলাম না-তবু

তোমরা আমার নাগালের বাইরে | চললাম।

আমি তোমাদের কাছে থাকবার অযোগ্য

এই কলকাতা শহরেই মাঝে মাঝে অদ্ভুত গলি দেখা যায় এক একটা | ট্রাম লাইন থেকে দূরে, একে বেঁকে চলে গেছে এ-বাড়ি ও-বাড়ির পাশ দিয়ে। ছুপুরে অদ্ভূত নির্জন নিঃশব্দ হয়ে যায় গলিট| | বাড়ির কপাট জানাল! সব